অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ( BRTA) অফিস আকুণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এমন একটি অফিস যার অফিস পিয়ন থেকে শুরু করে সহকারী পরিচালক পর্যন্ত সকলেই আপাদমস্তক দুর্নীতি আর বেআইনি কর্মকাণ্ডে নিমজ্জিত। এই অফিসে শীর্ষ কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিন:) মো: ফারুক আলম (অ:দা) এর আগে রংপুর ও বর্তমান কর্মস্থল কুমিল্লাতেও দুর্নীতি আর বেআইনি কর্মকাণ্ডের কারণে হয়েছেন সংবাদ শিরোনাম। নামে বেনামে গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।।
এ অফিসে সর্ব ঘটে কাঁঠালিকলা মোটরযান পরিদর্শক সেলিম হাসান। যাঁর অভিনব কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে ” দুপুরে ফেল, সন্ধ্যায় পাশ”!! অর্থাৎ যানবাহনের লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ২০ নাম্বারের লিখিত পরীক্ষায় ৮ পেলেই পাশ। এক্ষেত্রে কেউ ৫/৬ পেলে বা ৩/৪ বা “০” শূন্য পেলেও সমস্যা নেই। দালালদের মাধ্যমে সরকারি ফিসের বাইরে ১০/১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত ধরিয়ে দিলেই কৃতকার্যদের তালিকায় এসব নাম উঠে আসে। কখনোবা ওয়েটিং লিস্ট ও বর্ধিত তালিকাতেও ফেল করা প্রার্থীদের নাম “স্বমহিমায় উদ্ভাসিত” হয়ে উঠে।। আবার কেউ সাদা খাতা জমা দিলেও মানে লেখাপড়া একদম না জানা প্রার্থীরাও ২০ হাজার অতিরিক্ত দিতে পারলেই ১৫/১৬ দিনের মধ্যেই পেয়ে যাচ্ছে হেবি গাড়ির ( লার্নার ) বা প্রাথমিক শিক্ষানবিশ বাধ্যতামূলক লাইসেন্স।। এই লেখাপড়া না জানা প্রার্থীরা মহাসড়কে উঠে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে শতশত প্রাণ।। সরকারি হিসেবে প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার জনের মৃত্যূর কথা উল্লেখ করা হলেও সড়ক মহাসড়কের দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণাকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হিসেবে এ সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার।।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কথা বলা হলেও এসব অযোগ্য ড্রাইভারদের লাইসেন্স প্রদানকারী বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক সেলিম হাসান ও সহকারী পরিচালক ফারুক আলমদের মতো কর্মকর্তাদের অর্থলিপ্সুতার কথা কখনো মিডিয়ার সামনে উত্থাপন করা হয়নি।।
রায়হান গত ৫ বছর ধরে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে নিজের মোটরসাইকেল দিয়ে কর্মস্থলে আসা-যাওয়া করেন। কিন্তু এখনো নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে পারেননি তিনি। গত তিন বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অফিসে কাগজপত্রসহ ফি জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু অফিস থেকে নানা জটিলতা দেখিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে মোটরসাইকেল নিয়ে চলার পথে অসংখ্যবার জরিমানা দিতে হয়েছে তাঁকে।
১৭ই সেপ্টেম্বর সরেজমিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিআরটিএ অফিসে গিয়ে রায়হানের মতো আরও বেশ কয়েকজনকে নানা সমস্যা নিয়ে আশপাশে পায়চারি করতে দেখা যায়।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় এমদাদ হোসেন নামের এক ভুক্তভোগীর। তিনি বলেন, আমি একটি বেসরকারি সংস্থায় ফিল্ড অফিসার হিসেবে নবীনগর উপজেলায় কর্মরত। ২০২৫ সালে মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করি। সব প্রক্রিয়া শেষ করার পর ভাইভাতে আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়, আমি কারও মাধ্যমে লাইসেন্স করতে এসেছি কি না? আমি না সূচক উত্তর দেওয়ায় আমাকে বের করে দেওয়া হয়। পরে সরকারি লাইসেন্স ফি আড়াই হাজার টাকার স্থলে বিআরটিএ’র স্টাফ সজীব হাসানের মাধ্যমে ১২ হাজার টাকায় চুক্তি করি। তারপরও দীর্ঘদিন ধরে আমাকে ঘুরতে হচ্ছে। এই ঘুরাঘুরি করতে করতে আমি একদম ত্যক্ত বিরক্ত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সার্কেল অফিস দালালদের জন্য টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স উন্মুক্ত। এখানে চিহ্নিত কয়েকজন দালালের আধিপত্য রয়েছে এক যুগ ধরে। এর মধ্যে জাবেদ, ইব্রাহিম, আজাদ, শাহ আলম, মোস্তাকিম, আবুল, খোকন, শরীফ, শাহ আলম, সামীর ও আহসানের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁরা অফিসের ফটকের সামনেই বেঞ্চ পেতে বসে থাকেন। এছাড়া কিছু দালাল আশেপাশের চায়ের দোকান, ফটোস্ট্যাটের দোকানে বসে গ্রাহকদের কাছ থেকে কাগজপত্র ও কর্মকর্তাদের চাহিদা মোতাবেক নগদ টাকা হাতিয়ে নিয়ে মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট ফাতেমা আক্তার প্রিয়ার হোয়াটসঅ্যাপে কাগজপত্রের ছবি পাঠিয়ে দিলেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে এসব চিহ্নিত দালালদের সাথে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক সজীব হাসান, অফিস সহায়ক রাশেদ নিজাম ও মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট ফাতেমা আক্তার প্রিয়ার সাথে রয়েছে গভীর সখ্যতা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করার পর প্রাথমিক অবস্থায় লার্নার প্রদান করা হয়। পরে ধাপে ধাপে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা, ভাইভা ও ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়া হয়। কিন্তু দালাল ছাড়া এই প্রক্রিয়া করা প্রায় অসম্ভব। পদে পদে বিভিন্ন অজুহাতে অফিস থেকে লাইসেন্স আবেদনকারীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে বাধ্য হয়ে দালালের দারস্থ হতে হয় আবেদনকারীদের। তারা লাইসেন্সপ্রতি ১০/১৫ হাজার থেকে ২০/২৫ হাজার টাকা নিয়ে থাকেন। এর মধ্যে ডোপ টেস্ট থেকে শুরু করে ভাইভা, ফিঙ্গার প্রিন্ট— সবকিছু দালালরাই ম্যানেজ করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে মাত্র ৮ হাজার ২৫০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশার লাইসেন্স আছে।
জেলার বিজয়নগরের কালাছড়া গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রোমান মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ২০১৮ সালে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে এক দালালকে ১২ হাজার টাকা দেন। কয়েক দিন ঘোরানোর পর তাকে আর পাওয়া যায়নি। পরে কসবার কামালপুরের দালাল শাহ আলমের সঙ্গে ১৮ হাজার টাকায় চুক্তি করি। এরপরও প্রায় তিন বছর কেটে গেল। লাইসেন্স পাওয়া হলো না।
শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্সই নয়,ফিটনেস, মালিকানা বদল, রোড পারমিট, চোরাই গাড়ির জাল কাগজ তৈরি সহ বিভিন্ন খাত থেকে প্রতি মাসে ২০ কর্মদিবসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিআরটিএতে অবৈধ কালেকশন হয় দেড় থেকে দু কোটি টাকা। দালালদের কমিশন বাদে জমাকৃত এই অবৈধ টাকার ৭০% তুলে নেন সহকারী পরিচালক ও মোটরযান পরিদর্শক নিজ নিজ ঝুলিতে। বাকি ৩০% টাকা ভাগ হয় পদ পদবী অনুযায়ী বাকি স্টাফদের মাঝে।
এসব বিষয়ে জানতে সহকারী পরিচালক ও মোটরযান পরিদর্শকের হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হলেও তাঁরা রিসিভ না করাই তাৎক্ষণিক বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।।
সচেতন এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা বলেন প্রতি বুধবার ও বৃহস্পতিবার বিকালে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করলে অবৈধ টাকাসহ অনেককেই হাতেনাতে গ্রেফতার করা সম্ভব।।