কামাল পারভেজ, বিশেষ প্রতিনিধি:
গবেষণা, নীতিনির্ধারণ ও জনসম্পৃক্ত উদ্যোগে গড়ছেন ন্যায্য ও বাসযোগ্য নগরের স্বপ্ন।
মোহাম্মদ এজাজ একজন লেখক, গবেষক, শিক্ষক, নগর নীতি বিশ্লেষক ও পরিবেশকর্মী। নদী, জলাভূমি, নগর ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত নদী, মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ইতিহাস ও ভূরাজনীতি নিয়ে তাঁর গবেষণা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণা, নীতি বিশ্লেষণ ও জনসম্পৃক্ত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের নগর ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি।
রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মোহাম্মদ এজাজ নগর জলাভূমি পুনরুদ্ধার, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং নগর পরিকল্পনায় কাঠামোগত বৈষম্য দূর করার বিভিন্ন উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর কাজের অন্যতম লক্ষ্য হলো নগর উন্নয়নের সঙ্গে প্রকৃতি, পরিবেশগত ভারসাম্য ও সাধারণ মানুষের অধিকারকে সমন্বিত করা।
শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত জীবন:
সাবেক জাতীয় অ্যাথলেট ও আর্ম রেসলার মোহাম্মদ এজাজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এমবিএ এবং ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পাবলিক পলিসি, অর্থনীতি, টেকসই উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রায় এক দশক শিক্ষকতা করার পর তিনি দেশের আর্থসামাজিক ন্যায়ভিত্তিক রূপান্তর ও পরিবেশগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
বঙ্গীয় ব-দ্বীপ অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শাসনামলে গড়ে ওঠা সম্পদ ব্যবস্থাপনার কাঠামো এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে। আরডিআরসির গবেষণা, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও নীতিগত প্রচারণার মাধ্যমে তিনি পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান বৈষম্য চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করছেন।
নগর পরিকল্পনা ও জলাভূমি পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ:
ঢাকা ও খুলনা শহরকে ন্যায়ভিত্তিক নগরে রূপান্তরের লক্ষ্যে মোহাম্মদ এজাজের বিভিন্ন গবেষণা ও উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘পিপলস চার্টার’ বা ন্যায্য নগর ইশতেহার, ‘ঢাকা রিভার্স’ এবং ‘ঢাকা বিভাগের নদ-নদীর বেসলাইন জরিপ’। এসব গবেষণায় নগরের জলাবদ্ধতা, নদী ও জলাশয়ের সংকট এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
‘ঢাকা শহরের খাল ও জলাধার’ প্রকল্পের নেতৃত্বে তিনি রাজধানীর অবহেলিত ও দখল হয়ে যাওয়া জলাধারগুলো চিহ্নিত, মানচিত্রায়ন ও নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এসব জলাধার পুনরুদ্ধারের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর লেখা ‘ঢাকার নদী ও জলাশয়’ বইটি নগরের নদী ও জলসম্পদ নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের কাছে আলোচিত একটি প্রকাশনা।
একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের অংশ হিসেবে তিনি ‘রিওয়েট’ প্রকল্পের অন্যতম পরিকল্পনাকারী। এ উদ্যোগে নগর জলাভূমি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সামাজিক ন্যায়বিচারকে যুক্ত করা হয়েছে। শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়, জলাধার ও তার আশপাশের জমিতে কৃষিকাজ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের একটি কার্যকর মডেল গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকার গুলশান-বনানী লেক পুনরুদ্ধারে কড়াইলের বাসিন্দা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে কাজ করছেন তিনি। স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে প্রাণ, প্রকৃতি ও কৃষিভিত্তিক নগর ব্যবস্থাপনার ধারণাকে এগিয়ে নেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও নদীর কৌশলগত ভূমিকা:
মোহাম্মদ এজাজের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নদীগুলোর কৌশলগত ও প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা নিয়ে তাঁর গবেষণা ২০২২ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়। ‘মুক্তিযুদ্ধে নদী’ শীর্ষক এ গবেষণায় মুক্তিযুদ্ধের সামরিক বাস্তবতা ও নদীনির্ভর ভূপ্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
‘১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধে নৌ অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক তাঁর গবেষণাধর্মী বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের নৌ অভিযান, সামরিক কৌশল ও ভূপ্রকৃতিগত বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘ব্যারাক থেকে ব্যাটলফিল্ড’ শীর্ষক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রকল্পটিতে মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা, নেতৃত্ব, অবদান ও সামরিক কর্মকৌশল বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নদী রক্ষা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার:
‘রিভারাইন আরবানিজম’ উদ্যোগের মাধ্যমে শহরের নদী, শিল্পদূষণ ও নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা নিয়ে কাজ করছেন মোহাম্মদ এজাজ। তুরাগ নদীতীরের মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক বাস্তবতা, শিল্পকারখানার দূষণের প্রভাব এবং উচ্ছেদের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন রয়েছে।
নদীকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও অধিকার রক্ষার ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করেন তিনি। তুরাগ নদীতীরের ৭০টি জেলে গ্রামের জনগোষ্ঠীর অধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং নদী দূষণবিরোধী উদ্যোগের পক্ষে তাঁর কার্যক্রম এ দৃষ্টিভঙ্গির অংশ।
তিনি পূর্বে ‘রিভারাইন পিপল’ নামের নাগরিক সংগঠনের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গীয় ব-দ্বীপ অঞ্চলে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় তৃণমূল সংগঠন, নেটওয়ার্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুব-নেতৃত্বাধীন ‘রিভার কনজারভেশন ক্লাব’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে কাজের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। ‘জিবিএম বেসিন পিপলস নেটওয়ার্ক’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সহসভাপতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময়ে কাজ করছেন। আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন ও রাজনীতি নিয়ে বাংলায় প্রকাশিত তাঁর গবেষণাধর্মী বই ‘পানি চুক্তির রাজনীতি’ এ বিষয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
দূষিত নদী ও বৃক্ষনিধন নিয়ে গবেষণা:
গবেষণা ও নীতিগত প্রচারণার মাধ্যমে নদীদূষণ, অবৈধ বালু উত্তোলন ও বৃক্ষনিধনের বিষয়গুলো জনপরিসরে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও সক্রিয় মোহাম্মদ এজাজ। তাঁর নেতৃত্বে প্রকাশিত ‘রিভার ফাইল’ প্রতিবেদনে দেশের দূষিত নদী ও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের পাশাপাশি নরসিংদীর হাড়িধোয়া, হবিগঞ্জের সুতাং এবং গাজীপুরের লবণদহী নদীর দূষণ পরিস্থিতিও আলোচনায় আসে।
তাঁর নেতৃত্বে গত চার বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে ‘লগিং অব ট্রিস’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন। এতে সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পের কারণে দেশে বৃক্ষনিধনের পরিস্থিতি তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নদী ও পরিবেশসংক্রান্ত এসব গবেষণা জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত পরিবর্তনের পক্ষে আলোচনাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছে।
তরুণদের সম্পৃক্ততা ও ন্যায্য নগর আন্দোলন:
‘জাস্ট আরবান’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কয়েক হাজার মানুষকে সম্পৃক্ত করে ন্যায্য নগর ইশতেহার তৈরির উদ্যোগ নেন মোহাম্মদ এজাজ। এতে নগরায়ণে সামাজিক সমতা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ২৫টি যুব-পরিচালিত সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত নগরভিত্তিক অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম ‘ইউথ ফর ফেয়ার সিটিজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন তিনি। প্ল্যাটফর্মটি দেশের শহরগুলোর বিভিন্ন সমস্যা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নগর নীতিসংক্রান্ত বিষয়ে প্রচারণা ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে।
নদী গবেষণাবিষয়ক বাংলা জার্নাল ‘অববাহিকা’র সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ এজাজ। পাশাপাশি ‘ডায়ালগ উইথ মোহাম্মদ এজাজ’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হিসেবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও ধর্মীয় চিন্তাবিদদের সঙ্গে নগর, পরিবেশ এবং গ্লোবাল সাউথের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের গবেষক ও চিন্তাবিদ তৈরিতেও তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নগর প্রশাসন ও ভবিষ্যতের ভাবনা:
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোহাম্মদ এজাজ পরিবেশগতভাবে সহনশীল, সাংস্কৃতিকভাবে বহুত্ববাদী এবং সামাজিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক নগর গড়ার ধারণাকে সামনে আনেন। এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন মেয়র সম্মেলনে ঢাকা শহরের প্রশাসক ও নগর বিশেষজ্ঞ হিসেবে অংশ নিয়ে নগর বৈষম্য দূর করা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্য হ্রাসে নগর ব্যবস্থাপনার ভূমিকা তুলে ধরেন।
তাঁর নগর ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে উন্নয়নের সমন্বয়, অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন শক্তিশালী করা এবং নাগরিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত সবুজ গণপরিসর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা।
নদী, জলাভূমি, পরিবেশ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও নগর নীতিকে গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্র হিসেবে যুক্ত করে মোহাম্মদ এজাজের কাজ একটি বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে—উন্নয়নের সুফল কারা ভোগ করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কার অধিকার নিশ্চিত হবে। তাঁর গবেষণা ও জনসম্পৃক্ত উদ্যোগের মূল লক্ষ্য একটি ন্যায্য, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার পথে কার্যকর ভূমিকা রাখা।