অনুসন্ধানী প্রতিবেদক ঢাকা:
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক পেতাত্মা ও শেখ হাসিনার প্রিয়জন খ্যাত ব্যক্তি ঢাকা এল এ শাখা-৩ এর কানুনগো। নাম চুন্নু মিয়া। ঘুষ দুর্নীতি ও জাল জালিয়াতিতে সিদ্ধহস্ত। ইতোমধ্যে দুনম্বরী ধান্ধার টাকায় নামে-বেনামে গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।
অভিযোগ উঠেছে চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে একই স্টেশনে বদলি হয়ে ঘুরেফিরে বারবার। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল এ শাখায় কানুনগো চুন্নু মিয়া খুঁজে পেয়েছেন গুপ্তধনের সন্ধান। তাই অন্যত্র তাঁকে বদলি করে দিলেও গোপনসিঁড়ি ব্যবহার করে নানাবিধ তদবির, উপঢৌকন ও ব্রিফকেস ভর্তি টাকা লগ্নি করে তিনি ফিরে আসেন এল এ শাখা-৩ ঢাকাতে।
ল্যান্ড একুজিশন (Land Acquisition) বা এল.এ (LA) শাখা হলো জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব শাখা। এই শাখার মূল কাজ হলো সরকারের উন্নয়নমূলক বা জনস্বার্থমূলক কাজের (যেমন— রাস্তাঘাট, সেতু, রেললাইন, স্কুল, হাসপাতাল বা সরকারি স্থাপনা নির্মাণ) জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন স্থাবর সম্পত্তি বা জমি আইন অনুযায়ী অধিগ্রহণ করা।
এল.এ শাখার প্রধান কাজগুলো হলো:
সরকারের কোনো দপ্তর বা সংস্থা যখন জমির প্রয়োজন হয়, তখন তারা ডিসি অফিসের এল.এ শাখায় অধিগ্রহণের প্রস্তাব পাঠায়।
আইন অনুযায়ী জমি মালিকদের প্রাথমিক নোটিশ দেওয়া হয় এবং তাদের কোনো আপত্তি থাকলে তা শুনানি করা হয়।
কানুনগো এবং সার্ভেয়ারদের মাধ্যমে সরেজমিনে জমির মাপজোখ করে জমির প্রকৃতি ও বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়।
অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের আইনানুগ ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া নিশ্চিত করা হয়।
জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া বা ‘এল.এ কেস’ এই শাখার মাধ্যমেই পরিচালনা করা হয়।
উল্লিখিত এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দুর্নীতিবাজ কানুনগো ও সার্ভেয়াররা রাতারাতি বনে যান কোটিপতি। এই অফিস থেকে সম্প্রতি বদলি হয়ে যাওয়া “সমর কুমার সূত্রধর “ বা কানুনগো চুন্নু মিয়ার মতো অনেকেই আছে যাঁরা নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি থেকে উঠে এসে এলএ শাখার সার্ভেয়ার বা কানুনগো পদে যোগদান করে হয়েছেন রাতারাতি এলাকার ডাকসাইটে অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তিত্ব। অথচ ১০ম গ্রেডের এসব কর্তাদের বেতন ভাতা কতো তা জানে সরকার ও সর্বসাধারণ।। তবে বিভাগীয় পর্যায়ে অবৈধ সম্পদ অর্জনের পথ নীরিক্ষা কর্তাদেরকেও এর ম্যানেজ করে চলন। শোনা যায় দুদক এনফোর্সমেন্ট টিমেও এদের আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী বিদ্যমান, তাই এদের টিকিটিও কেউ স্পর্শ করতে পারেনা।
ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও ভূমি সংস্কার বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন কি সরকারি চাকুরির বিধিমালা লংঘন করে বিশেষ কারিশমায় চুন্নু মিয়া এলেন আবারো ঢাকা এল এ শাখায়। ঢাকায় এল এ শাখায় যোগদান করেই তাঁর সেই সিন্ডিকেটকে আরও শক্তিশালী করে করে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চারপাশে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব প্রভাব বলয়।
ভূমি মন্ত্রণালয় ও ভূমি সংস্কার বোর্ডের প্রচলিত নিয়ম ও প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মাঠ প্রশাসনে কোনো কর্মচারী যে স্টেশনে ‘সার্ভেয়ার’ হিসেবে কর্মরত থাকবেন, পদোন্নতি পেয়ে ‘কানুনগো’ হওয়ার পর কোনোভাবেই আর পূর্বের ঔ একই স্টেশনে বা শাখায় যোগদান বা বদলি হতে পারবেন না। দীর্ঘদিন ঢাকা এলএ শাখায় সার্ভেয়ার হিসেবে সুনামের সাথে নয়, বরং বিতর্কিতভাবে কর্মরত ছিলেন চুন্নু মিয়া। সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের বড় পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় তিনি কানুনগো (১০ম গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান। কানুনগো হিসাবে পদোন্নতির জন্য তিনি খরচ করেন কোটি টাকার উপরে অনুসন্ধানে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকুরির শৃঙ্খলা বিধিমালা ভঙ্গ করে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে মোটা অংকের অর্থ ঢেলে তদবিরের মাধ্যমে তিনি আইনকে ফাঁকি দিয়ে পুনরায় পূর্বের লাভজনক কর্মস্থল অর্থাৎ ঢাকা এলএ শাখাতেই কানুনগো হিসেবে পদায়ন ও বদলির আদেশ বাগিয়ে নেন। যেখানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে চাকুরির ক্ষেত্রে অনৈতিক তদবির বা নিয়মবহির্ভূত পদায়ন শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সেখানে চুন্নু মিয়ার ক্ষেত্রে এর উল্টো চিত্র দেখে সচেতন মহল ও তাঁর কলিগরাও বিস্মিত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত ভূমির প্রকৃত মালিকদের ক্ষতিপূরণ ও অবকাঠামোর টাকা ছাড় করানোর মূল চাবিকাঠি এখন কানুনগো চুন্নু মিয়ার হাতে। ভুক্তভোগী জমি মালিকদের অভিযোগ, এলএ শাখা-৩ এ ক্ষতিপূরণের ফাইলের প্রসেস ও চেকে স্বাক্ষর করানোর জন্য কানুনগো চুন্নু মিয়াকে ৫% থেকে ২০% পর্যন্ত সরাসরি ক্যাশ কমিশন দিতে হয়। ঘুষের টাকা না দিলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়, বিভিন্ন ধরনের মনগড়া ভুয়া ত্রুটি কিংবা আইনি জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ মানুষদের হয়রানি করা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখানেই শেষ নয় ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর চুন্নু মিয়া হাসিনা সরকারের আমলে বছরের পর আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে ঢাকা এল এ শাখায় কর্মরত ছিলেন । ঢাকা এল এ শাখায় থেকে ঘুষ দুর্নীতি নানান অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চুন্নু মিয়া ও তাঁর সিন্ডিকেট । চুন্নু মিয়ার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও কোন ব্যবস্থা নেননি ঐ সময়কালীন হাসিনা প্রশাসন।
৫ ই আগস্ট ২০২৪ ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অভিযোগে চুন্নু মিয়াকে ঢাকা এল এ শাখা থেকে বদলি করা হয়। তবে এই বদলির কয়েক মাস যেতে না যেতে আবার চুন্নু মিয়া এলেন বিপুল অর্থ খরচ করে ঢাকা এল এ শাখাযতেই। এসেই পূর্বের সিন্ডিকেট সচল করে বেপরোয়াভাবে চলছে তার ঘুষ দুর্নীতি নানান অনৈতিক কর্মকাণ্ড । এই ফ্যাসিস্টের দোসর চুন্নু মিয়া দল বেঁধে শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে টুঙ্গিপাড়ায় ফুল দিতে গিয়েছেন একাধিকবার ঘটা করে । এসময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই ছবিই প্রমাণ করে তার অতীত কর্মকাণ্ড কি ছিল।
সাধারণ একজন সরকারি কর্মচারী হয়েও বিগত বছরগুলোতে ঢাকা এলএ শাখার বিপুল অর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন চুন্নু মিয়া। নামে-বেনামে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, প্লট এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিকানা গড়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যা তার বৈধ আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। এইসব সম্পদের বেশিরভাগই করেছেন স্ত্রী ও আত্মীয়-স্বজনের নামে। আর এসব করেছেন আইনের হাত থেকে রক্ষা পেতে ।
ঢাকা এলএ শাখার এই ওপেন সিক্রেট দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমি দানকারী সাধারণ নাগরিকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই বিতর্কিত কানুনগো চুন্নু মিয়ার অবৈধ বদলি বাতিলসহ তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অন্যদিকে ঢাকা এল এ শাখার কানুনগো চুন্নু মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি রিসিও না করাই তাঁর বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।।