অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
ঘুষ দুর্নীতি, জাল জালিয়াতি, জমির শ্রেণী পরিবর্তন,পে অর্ডারের টাকা আত্মসাৎ, AP/VPসহ বন বিভাগের জমি ব্যক্তি মালিকানা ও ডেভলপার কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে ব্যাপক আলোচনায় রয়েছেন সাব রেজিস্ট্রার নাজমুল হাসান। শুরু থেকেই দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড হিসেবে খ্যাত নাজমূল হাসান ইতোমধ্যে তাঁর পূর্বতন কর্মস্থলগুলোর মতো ঢাকার নবাবগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসকেও পরিণত করেছেন লুটপাট বাণিজ্যের অভয়ারণ্যে। জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে হায়ার ভ্যালু ও আন্ডার ভ্যালুর মারপ্যাঁচে ফেলে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নিজস্ব অফিস স্টাফ ও দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঢাকার নবাবগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসেও গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ক্ষমতার বলয়। সহকারী, নকলনবিশ ও উমেদারদের মাধ্যমে সেরেস্তা খরচের নামে প্রতি লাখে দু হাজার টাকা হিসেবে জমির মূল্যবধরে ক্যালকুলেটরে হিসেব করে টাকা বুঝে নেন নাজমূল হাসান।। আর এভাবেই অবৈধ পন্থায় অর্জিত টাকায় গুলশানে নিজস্ব ফ্লাটে রাজকীয় জীবনযাপন করেন এই সাব রেজিস্ট্রার। সন্তানদের পড়াশুনা করান রাজধানীর দামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য রয়েছে ৪/৫ টি কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি। রাজধানী ঢাকাতে একাধিক ফ্লাট প্লট ছাড়াও মানিকগঞ্জ সদর, সাটুরিয়া ও সাভারেও রয়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ। বাড়ি, ফ্লাট, কৃষি জমি,মাছের ঘের ও বাণিজ্যিক স্পেস।
নবাবগঞ্জ ও ধামরাই সাব রেজিস্ট্রি অফিসের স্থানীয় কয়েকজন দলিল লেখক, সেবা গ্রহণকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে নানা ধরনের হয়রানি ও মোটা অংকের অতিরিক্ত অর্থ না নিয়ে সাব রেজিস্ট্রার কোনো দলিলে স্বাক্ষর করেন না। ভূক্তভোগীদের দাবি, সাব রেজিস্ট্রার নাজমূল হাসানের নেতৃত্বাধীন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে এই অফিসকে ঘিরে। যারা বিভিন্ন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এর ফলে সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও দলিল লেখকরা বাধ্য হয়ে সাব রেজিস্ট্রারের চাহিদা মোতাবেক অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করে থাকেন৷ অন্যথায় বিভিন্ন অযুহাতে কালক্ষেপণ, দলিলে মনগড়া সমস্যা উত্থাপন যেমন পর্চা ঠিক নেই, নামজারিতে সমস্যা আছে,ভোটার আইডি কার্ডে নামের বানান ভুল আছে এসব তুলে ধরে দলিল নিবন্ধন কস্মিনকালেও সম্ভব নয় বলে জবাব দিয়ে দেওয়া হয়। আবার সাব রেজিস্ট্রারের চাহিদা মোতাবেক টাকা দিয়ে দিলে হাজারো সমস্যা যুক্ত জমিও আধাঘণ্টা-একঘণ্টার মধ্যেই রেজিস্ট্রি হয়ে যায়।।
অভিযোগ রয়েছে, মো.নাজমুল হাসান দেশের বিভিন্ন উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একই ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কয়েকটি সূত্রের দাবি, অতীতেও তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা পড়েছিল। তবে সেসব অভিযোগের তদন্ত বা নিষ্পত্তি সম্পর্কে দৃশ্যমান কোনো শাস্তির ব্যবস্থা অদ্যবধি না হওয়ায় সাব রেজিস্ট্রারের ক্ষুধা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৪ বছরের চাকরি জীবনে বিপুল পরিমাণ অবৈধ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজ নামে ছাড়াও স্ত্রী, শ্যালক, শ্যালিকাদের নামে বিভিন্ন স্থানে জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মানিকগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় তার পরিবারের সদস্যদের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি রয়েছে। এছাড়া একটি বিশাল মাছের ঘের, সাটুরিয়ায় বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি সহ একাধিক আবাসিক ফ্ল্যাট এবং নির্মাণাধীন ভবনে বিনিয়োগের তথ্যও পাওয়া গেছে।
একজন সাব-রেজিস্ট্রারের সরকারি বেতন-ভাতা অনুযায়ী তার মোট বৈধ আয়ের সঙ্গে বর্তমান জীবনযাত্রা ও সম্পদের পরিমাণের ব্যাপক অসামঞ্জস্য রয়েছে। তাদের মতে, বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নিবন্ধন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।
এ বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার মো. নাজমুল হাসানের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।