
অনুসন্ধানী প্রতিবেদক নওগাঁ ও রানীনগর:
রানীনগর উপজেলা ভূমি অফিসে সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। অফিসে কর্মরত কানুনগো শামীম আলীর নেতৃত্বে এই ভূমি অফিস আপাদমস্তক ” দুর্নীতির ভারে ভারাক্রান্ত “। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এই অফিসের পিয়ন থেকে কানুনগো প্রতিটি টেবিল চেয়ারে রয়েছে প্রকাশ্য দুর্নীতির ফাঁদ পাতা। সরকারি ফিসের বাইরে এখানে চাহিদা মোতাবেক টাকা না দিলে দিন শেষে সব ফাইল জমা পড়ে থাকে কানুনগোর কব্জায়। ভূক্তভোগিদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে সুস্মিতা লাহিড়ী, রুবেল হোসেন, যুবায়ের, সৌরভ, আ: কুদ্দুস, জয় প্রাং বা রূপা রানীরা সেসব ফাইলের মাথায় দিয়ে রাখেন বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন। সেই সব চিহ্নিত ফাইল দেখলে কানুনগো শামীম আলী বুঝতে পারেন যে, ভুক্তভোগী বা দালালের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে। তখন সেই চিহ্নিত ফাইলগুলো কানুনগো নিয়ে যান এসিল্যান্ড নাবিলা ইয়াসমিনের রুমে। আর যারা চাহিদা মোতাবেক টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তাদের ফাইল আটকে রেখে বছরের পর বছর ঘুরাতে থাকেন।
রানীনগর উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগোর বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই না করার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। দিনের পর দিন অফিসে ঘুরেও বৈধ কাগজপত্র বা নামজারি ও পরিমাপের কাজ সম্পন্ন করতে না পেরে চরম হতাশার মধ্যে রয়েছেন ভূমি মালিকরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নামজারি, মিসকেস নিষ্পত্তি এবং জমির মাপজোখ বা সার্ভে সংক্রান্ত প্রতিটি সেবা পাওয়ার জন্যই এ অফিসের স্টাফদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। সরকার নির্ধারিত ফি বা নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রতিটি ফাইলের জন্য অতিরিক্ত ও অবৈধ লেনদেন এ অফিসে বাধ্যতামূলক। টাকা না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা এবং বছরের পর বছর সেবাগ্রহীতাদের ঘোরানোর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “জমির কাগজপত্রে সামান্য সংশোধনের জন্য মাসের পর মাস রানীনগর উপজেলা ভূমি অফিসে ঘুরছি। তাদের চাহিদা মোতাবেক ৫০ হাজার টাকা দিতে পারিনি বলে, নাবাবিধ ভুলত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে সামনের সপ্তায় আসেন, সামনের মাসে আসেন, এটা আমাদের এক্তিয়ারের বাইরে, ডিসি স্যারের সিগনেচার লাগবে, শুধু নাবিলা ম্যাডামের সহিতে কাজ হবেনা— এসব মনগড়া কথা বলে আমাকে ত্যক্ত বিরক্ত করে ফেলেছে।
অনেক সময় মোবাইল কল, ইমেইল বা লিখিত অভিযোগ পত্রের মাধ্যমে সহকারী কমিশনার( ভূমি) নাবিলা ইয়াসমিন বরাবর ভূক্তভোগীরা অভিযোগ পাঠালেও রহস্যজনক কারণে এসিল্যান্ড থাকেন নিশ্চুপ। প্রাপ্তিস্বীকার পত্র প্রেরণ বা সমস্যা সমাধানে তড়িৎ পদক্ষেপ নেওয়ার দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ নেই ভূক্তভোগীদের সামনে৷ মোট কথা এ অফিসে যে কোনো স্টাফের কাছে কাগজপত্র জমা দিলে দিন শেষে তা জমা হয় কানুনগোর টেবিলে।
উপজেলা ভূমি অফিসে এমন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং চরম আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষ হয়রানিমুক্তভাবে ভূমি সেবা পেতে পারেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কানুনগো শামীম আলীর ব্যক্তিগত ক্ষমতার বলয়ে এখানে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটে অফিস সৃটাফ ছাড়াও স্থানীয় চিহ্নিত ভূমি দস্যু, কতিপয় দ্বিতীয় সারির রাজনৈতিক নেতা, কতিপয় ক্যাডার ও বেশ কয়েকজন দলিল লেখক। এই সিন্ডিকেটের বাইরে কারো কোনোরকম সেবা পাওয়ার সুযোগ নেই। আর কোনো শিক্ষিত সচেতন মানুষ শুধুমাত্র সরকারি ফিসের টাকা জমা দিয়ে কোনো কাজ করাতে গেলে তাঁকে নানাবিধ মনগড়া ভোগান্তিতে ফেলে নাজেহাল করা হয়। কখনো বলা হয় ভোটার আইডিতে বানান ভুল, কখনো বলা হয় পর্চা ঠিক নেই, কখনো মৌজা !!!
এছাড়া এপি,ভিপি,এলএ,জলমহাল, বালুমহাল, হাট চাঁদনি,ফিরনিবাস বরাদ্দ, নবায়ন ও ব্যবস্থাপনাতেও একছত্র অধিপত্যে কানুনগো শামীম আলী সিন্ডিকেট। অর্থাৎ এখানে প্রতিটি কর্মকাণ্ডে ” কানুনগো শামীমের কথায় শেষ কথা “।
এভাবে দালাল সিন্ডিকেট ও নিজস্ব ক্ষমতার প্রভাবে ইতোমধ্যে কানুনগো শামীম আলী গড়েছেন নামে বেনামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়। এছাড়া এ অফিসের ” এ টু জেড ” সকলেই বিত্ত বৈভবের পাহাড়ের চুড়ায় আহরণ করছেন বহু আগে থেকেই। মোট কথা এ অফিসে স্টাফদের আয়-ব্যায়ের কোনো সামঞ্জস্যতা নেই, তাদের স্থাবর অস্থাবর সম্পদের সাথেই মিল নেই বেতন কাঠামোর।
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই অফিসের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ও দুদক এনফোর্সমেন্ট টিমের ঝটিকা অভিযান কামনা করছেন৷