
চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলা শহরের এক বহুরূপী তরুণীর প্রেমের ফাঁদে পড়ে ‘প্রতারণা’র শিকার হয়েছেন কুমিল্লার ব্যবসায়ী রেজাউল করিম সবুজ নামের এক যুবক। শেষপর্যন্ত ওই যুবক একাধিকবার ‘আত্মহত্যা’করার চেষ্টাও করেছেন বলে অভিযোগ সূত্রে প্রকাশ। ধূর্ত তরুণীর নাম রজনী খাতুন তার বাবা শহিদ আলী বাবু, বাড়ি দামুড়হুদা সদর ইউনিয়নের দশমী পাড়ায় অর্থাৎ দামুড়হুদা মডেল থানার সামনের মহল্লায়। আয়ের উৎস হিসেবে দৃশ্যমান কোনো পেশা নেই তার। টার্গেটকৃত পুরুষদের সাথে কথিত প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণাই বহুরূপী এই নারীর মূল পেশা। তার প্রতারণার জালে জড়িয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন অনেক পুরুষ। এমনকি তার ছলনা ও প্রতারণার হাত থেকে রেহাই পাননি খোদ ব্যবসায়ী রেজাউল করিম সবুজ।
রজনী খাতুন নামে এই বহুরূপী নারীর প্রেমের ফাঁদে পড়ে সাড়ে ৪ লক্ষ টাকা খুঁইয়ে পথে বসেছেন তিনি। আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত কুমিল্লা বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন ব্যবসায়ী রেজাউল করিম সবুজ। মামলাটি কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বর্ণনায় প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী রেজাউল করিম সবুজ জানান, ২০২১ সালের দিকে দামুড়হুদা উপজেলাধীন সদর ইউনিয়নের দশমী পাড়া’র রজনী খাতুন (২৪) নামের নারীর সাথে রং নাম্বারে পরিচয় হয় তার। কুমিল্লা জেলার ঘোলপাশা ইউনিয়নের হাজী এলাকার মৃত নুর আহাম্মদ আলীর ছেলে রেজাউল করিম সবুজের সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরে শুরুতে মাঝে মধ্যে মুঠোফোনে একটু আধটু ভাব বিনিময়ের পর সামনাসামনি একে অপরকে দেখা হয়েছিলো। প্রথমবার সবুজের সাথে দেখা করতে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা থেকে ছুটে গিয়েছিলেন রজনী। প্রায় ৬ ঘন্টা কুমিল্লায় দু’জন মিষ্টি-মধুর আলাপ শেষে রজনী ফিরে আসেন চুয়াডাঙ্গায়। এরপর মুঠোফোনে দুজনের অহরহ আলাপচারিতার মাত্রা ও বিষয় স্বাভাবিক পর্যায় ছাপিয়ে ঐকান্তিক এক গতিপথ সৃষ্টির সাথে সাথে শুরু হয় দুটি হৃদয়ের ভাব-বিনিময়! আন্তরিকতা, ভাব-আবেগ আদান-প্রদানের মাত্রা চুড়ান্ত পর্যায় অতিক্রম করে এবার প্রেম নিবেদনের পালা! দুটি হৃদয়ের একান্ত ইচ্ছায় প্রেমের সম্পর্কে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন তারা। এরইমধ্যে সিদ্ধান্ত পাক্কা; খুব তাড়াতাড়িই বিয়ের পীড়িতে বসছেন দুজন।
হঠাৎ কিছুদিন পর মুঠোফোনে ফোন করে কান্নাকাটি জুড়ে দেন রজনী। আগামীকালই তার একটি ছোট অপারেশন করাতে হবে বলে জানিয়েছেন ডাক্তার। কিছু টাকা লাগবে। এরপর থেকে প্রায় প্রতিনিয়তই পরিবারের সদস্যদের নানা সমস্যা দেখিয়ে, বিকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছে রজনী খাতুন, তার বাবার তিন শতাংশ জমি বিক্রির চেষ্টা চলছে। জমি বিক্রি হওয়ার সাথে সাথেই রেজাউল করিম সবুজকে তার সমস্ত টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নিয়ম করে ধার হিসেবে বিভিন্ন অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয় রজনী।
রজনী তার সুচতুর অভিনয়, ছলচাতুরী ও প্রেমের মোহে অন্ধ হয়ে আগে-পিছে কোনো কিছু না ভেবেই দু-একদিন পরপরই বিকাশ একাউন্টসহ বিভিন্নভাবে বিভিন্ন অংকের অর্থ নিতেই থাকে রজনী। একপর্যায়ে হঠাৎ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে জরুরি ভিত্তিতে রজনীকে চলতি মাসের মাঝামাঝিতে ফোন করে তার কাছে আপাতত ৫০ হাজার টাকা ফেরত চাইলে কোনো টাকা দিতে পারবে না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় সে। রজনী’র আচরণে হঠাৎ এমন রহস্যময় পরিবর্তন লক্ষ্য করে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি আন্দাজ করেন রেজাউল করিম সবুজ।
তবে ভালোবাসার মানুষটি তার সাথে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে;যেনো বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তিনি। আরো একবার ফোন করে তার সমস্যা জানিয়ে ফের ৫০ হাজার টাকা ফেরত চাইলে,’কিসের টাকা,সে কোনো টাকাই নেয়নি’ বলে রজনীর কর্কশ জবাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন রেজাউল করিম সবুজ। মাথায় হাত দিয়ে হিসেব মিলিয়ে রেজাউল করিম সবুজ অগত্যা বুঝতে পারেন, বিগত দীর্ঘ ৪ বছর যাবত নিয়মিত রজনী তাদের জমি বিক্রি করে টাকা ফেরত দিবে জানিয়ে বিভিন্ন অংকের অর্থ হাতিয়ে নিতে নিতে তার ব্যবসায় পুঁজি হিসেবে খাটানো প্রায় লাখ দশেক টাকার পুরোটাই যে কব্জা করে নিয়েছে!
মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে রেজাউল করিম সবুজের। কোনরূপ উপায় খুঁজে না পেয়ে সর্বশেষ সরাসরি চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দশমী পাড়ায় রজনীদের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন রেজাউল করিম সবুজ। কিন্ত রজনী তার সাথে অশালীন ব্যবহার করে তাকে তার বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে; অন্যথায় লোকজন ডেকে তাকে মারধরের ভয়ভীতিও প্রদর্শন করে।
ভুক্তভোগী রেজাউল করিম সবুজ আরও জানান, নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে আশপাশের লোকজনদের জিজ্ঞেস করতেই বহুরুপী নারী রজনী আসল পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হন রেজাউল করিম সবুজ। আসলে দীর্ঘ ৪ বছর যার ছলনায় মত্ত হয়ে গভীর প্রেমে মগ্ন ছিলেন, স্ত্রী হিসেবে শীঘ্রই বিয়ের পীড়িতে বসবেন বলে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন,সেসব ভাবতেই শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু হিম হয়ে আসে তার।
আরো খোঁজখবর নিয়ে তিনি জানতে পারেন,
বহুগামী নারী রজনীর অসামাজিক কার্যকলাপে বিরক্ত ও অতিষ্ঠ অনেকেই।
সর্বশেষ দামুড়হুদা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হযরত আলীর নিকট তার প্রতারণার বিষয়ে বিচার দেন সবুজ। চেয়ারম্যান সমাধান করতে ব্যর্থ হয়। কোনো উপায় না দেখে সেখান থেকে বেরিয়ে শেষবারের মতো ফের রজনী’র বাড়িতে গিয়ে তার হাতে পায়ে জড়িয়ে ধরে কাকুতি মিনতি করে টাকাপয়সা ফেরত চাইলে সে তার সাথে চরম খারাপ ব্যবহার করে।
পরবর্তীতে টাকাপয়সা দাবি কিংবা এধরণের কোনো বিষয়ে তার বিরুদ্ধে থানা পুলিশকে তো দূরের কথা
এমতাবস্থায় কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে প্রতারিত সবুজ এই প্রতিবেদককে বলেন, আমার টাকা ফেরত পাওয়ার সাথে সাথে তার এমন পরিণতি কামনা করি;যেনো ভবিষ্যতে আমার মতো কারো সাথে এমন প্রতারণা করে সর্ব শান্ত করার সাহস না পায় সে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত তরুনী রজনী টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, সে বিকাশে টাকা পাঠিয়েছে, তবে একবারে নয়। এছাড়া সবুজ তাকে মিথ্যা তথ্য ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সাথে প্রতারনা করেছে।
অভিযুক্ত তরুনী রজনীর মা শাহনাজ বেগম বলেন, সে অবিবাহিত এবং অনেক সম্পদশালী, তার মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই এই মিথ্যা কথা বলে আমার মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে সে। তার মেয়েকে সবুজ ভালবেসে টাকা দিয়েছে। পাঁচশ থেকে সর্বোচ্চ একহাজার করে টাকা পাঠিয়েছে। একবারে এর চেয়ে বেশি টাকা কখনো দেয়নি সে।
রজনী ও সবুজের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক চলমান থাকার এক পর্যায়ে আমরা জানতে পারি সবুজ বিবাহিত এবং তার স্ত্রী সন্তান সব আছে।
এই কথা জানতে পেরে তার মেয়ে রজনী সবুজের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিন্ন করে। এ কারণে সে এখন আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে দামুড়হুদা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হযরত আলী বলেন, বিষয়টি শুনেছি। অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে উভয়পক্ষকে ডেকে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবো।